ঢাকা ০৬:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
যশোর কারবালা জামে মসজিদ উন্নয়নে ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার প্রাক্কলন অনুমোদন শিশু, কিশোর-কিশোরী ও নারী উন্নয়ন সচেতনতায় উঠান বৈঠক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী উখিয়ায় এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার, পালিয়ে গেল চোরাকারবারি কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ থেকেই হাফিজা খাতুন উচ্চবিদ্যালয়ে বিরোধের সূত্রপাত! বক্তব্য দিতে নারাজ শিক্ষক তৈয়ব আলী চকরিয়ায় বাস তল্লাশিতে ৯৯০০ ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা আটক শার্শায় পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে বাবা-ছেলেসহ তিনজনকে মারধরের অভিযোগ সঙ্কটে প্রেসক্লাব যশোর আহ্বায়ক, সদস্য সচিবসহ তিন সদস্যের পদত্যাগ বেনাপোল স্থলবন্দরে ফর্কলিফট দুর্ঘটনায় শ্রমিক আহত কক্সবাজারে বাসে ২৪ হাজার ইয়াবা, চালকসহ আটক ২ যশোর সীমান্তে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার চোরাচালানী মালামাল আটক করেছে বিজিবি

কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ থেকেই হাফিজা খাতুন উচ্চবিদ্যালয়ে বিরোধের সূত্রপাত! বক্তব্য দিতে নারাজ শিক্ষক তৈয়ব আলী

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:০০:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, মৌলভীবাজার :মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমকে ঘিরে চলমান বিরোধের নেপথ্যে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে দ্বন্দ্বের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে অনুসন্ধানে।

বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, ২০২৪ সালের পরীক্ষা তদারকি, প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

কোচিং বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে কোচিং বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগম সোচ্চার হওয়ার পর শিক্ষক মোহাম্মদ তৈয়ব আলী মীরের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে শ্যামলী রানী চন্দ্র, সারওয়ার হোসেন বাদল ও আফরোজা খাতুনসহ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে বিরোধ বিস্তৃত হয় বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্যে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে। ফলে অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের বক্তব্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের পরীক্ষা নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের পরীক্ষায় কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক পরীক্ষার হলে যথাযথ তদারকি না করে অফিস কক্ষে অবস্থান করেন এবং দায়িত্ব পালনের স্বাক্ষর দিয়ে আসেন। বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমসহ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রতিবাদ করেন বলে জানা গেছে।এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।

এরপরই কি শুরু হয় ধারাবাহিক অভিযোগ?

অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষিকার অবস্থানের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ আত্মসাত, টিফিনসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের বিষয়ও রয়েছে।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

তবে এসব আর্থিক অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হিসাব, অডিট প্রতিবেদন, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের অর্থ ও সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, নগদ ৫০০ টাকা ও এক মাসের কোচিং ফ্রি দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

এখনো বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একজন ছাত্রীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ওই ছাত্রীর মাকে বিদ্যালয় চলাকালীন অবস্থানের জন্য এখন পর্যন্ত প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যেই ওই নারীকে বিদ্যালয়ে অবস্থান করানো হচ্ছে। এ অর্থ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

অভিভাবকেরা কেন নীরব?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের কিছু সচেতন অভিভাবক চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

তাঁদের আশঙ্কা, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে সন্তানদের ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

চার শিক্ষকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চার শিক্ষকের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

মোহাম্মদ তৈয়ব আলী মীরের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এখন ব্যস্ত আছি।” এরপর তিনি কলটি কেটে দেন।

আফরোজা খাতুনের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

শ্যামলী রানী চন্দ্র বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে সারওয়ার হোসেন বাদল প্রথমে ফোন রিসিভ না করলেও পরবর্তীতে প্রতিবেদককে ফিরতি কল করে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করেন।

যা বললেন সারওয়ার হোসেন বাদল
রাশেদা বেগমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সারওয়ার হোসেন বাদল বলেন, রাশেদা ম্যাডামের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। বরং বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন বলে দাবি করেন।

তবে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তাঁদের একটি দাবি ছিল—বেতন ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা। তাঁদের পক্ষ থেকে এ দাবিই জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রাশেদা বেগমের বিরুদ্ধে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ আত্মসাত, টিফিন ও অন্যান্য খাতের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাদল বলেন, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব বিষয় নিয়ে বিদ্যালয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, এ ধরনের কোনো অনিয়ম থাকলেও তা একজনের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অডিট এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি যাওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। নিজের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি সাধারণত কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না এবং তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিলেও বিষয়টি জানা যাবে।

রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশের দিন কী ঘটেছিল?

রাশেদা বেগম যেদিন বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন, সেদিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সারওয়ার হোসেন বাদল বলেন, তিনি তখন তৃতীয় তলার একটি শ্রেণিকক্ষে ছিলেন। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে নিচে এসে দেখতে পান, রাশেদা বেগমকে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
তবে কারা তাঁকে তালাবদ্ধ করেছে, তা তিনি দেখেননি বলে জানান।

বিদ্যালয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ওই সময় এবং এর আগেও আনুমানিক ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে এবং আন্দোলনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এ বিষয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলে বাদল বলেন, এ বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না।

তিনি আরও জানান, ওইদিন উপস্থিত সাংবাদিকরাও তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, কিন্তু তিনি কোনো পক্ষ নিয়ে কথা বলার অবস্থানে ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, তিনি একজন শিক্ষক এবং একসময় তিনিও ছাত্র ছিলেন; তাই যা সত্য, সেটিই বলেছেন।

এখন সামনে যেসব প্রশ্ন
এই অনুসন্ধানে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগই কি বর্তমান বিরোধের অন্যতম কারণ?
প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগের নেপথ্যে কারা?
শিক্ষার্থীদের কি কোনো পক্ষের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? ৫০০ টাকা ও এক মাসের কোচিং ফ্রি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী?দশম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী ও তাঁর মাকে কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে? প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দেওয়ার অর্থের উৎস কী এবং কারা দিচ্ছেন?প্রভিডেন্ট ফান্ড, টিফিন ও অন্যান্য খাতের অর্থ নিয়ে প্রকৃত ঘটনা কী?অডিটে কী পাওয়া গিয়েছিল এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি কীভাবে গড়াল?

শেষ কথা
এসব অভিযোগের বিষয়ে অডিও, নথি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, অর্থনৈতিক হিসাব পরীক্ষা এবং প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা জরুরি।

বিশেষ করে যেসব শিক্ষক ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাঁদের বক্তব্যও এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতোমধ্যে সারওয়ার হোসেন বাদল তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করেছেন।

অপর তিনজন—মোহাম্মদ তৈয়ব আলী মীর, আফরোজা খাতুন ও শ্যামলী রানী চন্দ্রের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও যথাক্রমে ব্যস্ততার কথা বলে কল কেটে দেওয়া, ফোন রিসিভ না করা এবং দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হবে।

এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। নথি, অডিও-ভিডিও, প্রত্যক্ষ তথ্য, হিসাব-নিকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরাই অনুসন্ধানের লক্ষ্য।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন কোনো ব্যক্তিগত, প্রশাসনিক কিংবা আর্থিক বিরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এ জন্য বিষয়টির নিরপেক্ষ ও উচ্চমানের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

যশোর কারবালা জামে মসজিদ উন্নয়নে ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার প্রাক্কলন অনুমোদন

কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ থেকেই হাফিজা খাতুন উচ্চবিদ্যালয়ে বিরোধের সূত্রপাত! বক্তব্য দিতে নারাজ শিক্ষক তৈয়ব আলী

আপডেট সময় : ০৪:০০:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, মৌলভীবাজার :মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমকে ঘিরে চলমান বিরোধের নেপথ্যে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে দ্বন্দ্বের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে অনুসন্ধানে।

বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, ২০২৪ সালের পরীক্ষা তদারকি, প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

কোচিং বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে কোচিং বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগম সোচ্চার হওয়ার পর শিক্ষক মোহাম্মদ তৈয়ব আলী মীরের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে শ্যামলী রানী চন্দ্র, সারওয়ার হোসেন বাদল ও আফরোজা খাতুনসহ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে বিরোধ বিস্তৃত হয় বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্যে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে। ফলে অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের বক্তব্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের পরীক্ষা নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের পরীক্ষায় কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক পরীক্ষার হলে যথাযথ তদারকি না করে অফিস কক্ষে অবস্থান করেন এবং দায়িত্ব পালনের স্বাক্ষর দিয়ে আসেন। বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমসহ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রতিবাদ করেন বলে জানা গেছে।এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।

এরপরই কি শুরু হয় ধারাবাহিক অভিযোগ?

অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষিকার অবস্থানের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ আত্মসাত, টিফিনসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের বিষয়ও রয়েছে।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

তবে এসব আর্থিক অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হিসাব, অডিট প্রতিবেদন, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের অর্থ ও সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, নগদ ৫০০ টাকা ও এক মাসের কোচিং ফ্রি দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

এখনো বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একজন ছাত্রীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ওই ছাত্রীর মাকে বিদ্যালয় চলাকালীন অবস্থানের জন্য এখন পর্যন্ত প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যেই ওই নারীকে বিদ্যালয়ে অবস্থান করানো হচ্ছে। এ অর্থ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

অভিভাবকেরা কেন নীরব?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের কিছু সচেতন অভিভাবক চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

তাঁদের আশঙ্কা, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বললে সন্তানদের ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

চার শিক্ষকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চার শিক্ষকের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।

মোহাম্মদ তৈয়ব আলী মীরের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এখন ব্যস্ত আছি।” এরপর তিনি কলটি কেটে দেন।

আফরোজা খাতুনের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

শ্যামলী রানী চন্দ্র বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে সারওয়ার হোসেন বাদল প্রথমে ফোন রিসিভ না করলেও পরবর্তীতে প্রতিবেদককে ফিরতি কল করে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করেন।

যা বললেন সারওয়ার হোসেন বাদল
রাশেদা বেগমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সারওয়ার হোসেন বাদল বলেন, রাশেদা ম্যাডামের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। বরং বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন বলে দাবি করেন।

তবে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তাঁদের একটি দাবি ছিল—বেতন ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা। তাঁদের পক্ষ থেকে এ দাবিই জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রাশেদা বেগমের বিরুদ্ধে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ আত্মসাত, টিফিন ও অন্যান্য খাতের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাদল বলেন, ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব বিষয় নিয়ে বিদ্যালয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, এ ধরনের কোনো অনিয়ম থাকলেও তা একজনের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অডিট এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি যাওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। নিজের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি সাধারণত কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না এবং তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিলেও বিষয়টি জানা যাবে।

রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশের দিন কী ঘটেছিল?

রাশেদা বেগম যেদিন বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন, সেদিনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সারওয়ার হোসেন বাদল বলেন, তিনি তখন তৃতীয় তলার একটি শ্রেণিকক্ষে ছিলেন। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে নিচে এসে দেখতে পান, রাশেদা বেগমকে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
তবে কারা তাঁকে তালাবদ্ধ করেছে, তা তিনি দেখেননি বলে জানান।

বিদ্যালয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ওই সময় এবং এর আগেও আনুমানিক ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে এবং আন্দোলনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এ বিষয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলে বাদল বলেন, এ বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না।

তিনি আরও জানান, ওইদিন উপস্থিত সাংবাদিকরাও তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, কিন্তু তিনি কোনো পক্ষ নিয়ে কথা বলার অবস্থানে ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, তিনি একজন শিক্ষক এবং একসময় তিনিও ছাত্র ছিলেন; তাই যা সত্য, সেটিই বলেছেন।

এখন সামনে যেসব প্রশ্ন
এই অনুসন্ধানে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
কোচিং বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগই কি বর্তমান বিরোধের অন্যতম কারণ?
প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগের নেপথ্যে কারা?
শিক্ষার্থীদের কি কোনো পক্ষের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? ৫০০ টাকা ও এক মাসের কোচিং ফ্রি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী?দশম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী ও তাঁর মাকে কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে? প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দেওয়ার অর্থের উৎস কী এবং কারা দিচ্ছেন?প্রভিডেন্ট ফান্ড, টিফিন ও অন্যান্য খাতের অর্থ নিয়ে প্রকৃত ঘটনা কী?অডিটে কী পাওয়া গিয়েছিল এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে বিষয়টি কীভাবে গড়াল?

শেষ কথা
এসব অভিযোগের বিষয়ে অডিও, নথি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, অর্থনৈতিক হিসাব পরীক্ষা এবং প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা জরুরি।

বিশেষ করে যেসব শিক্ষক ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাঁদের বক্তব্যও এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতোমধ্যে সারওয়ার হোসেন বাদল তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করেছেন।

অপর তিনজন—মোহাম্মদ তৈয়ব আলী মীর, আফরোজা খাতুন ও শ্যামলী রানী চন্দ্রের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও যথাক্রমে ব্যস্ততার কথা বলে কল কেটে দেওয়া, ফোন রিসিভ না করা এবং দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে সংযুক্ত করা হবে।

এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। নথি, অডিও-ভিডিও, প্রত্যক্ষ তথ্য, হিসাব-নিকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরাই অনুসন্ধানের লক্ষ্য।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন কোনো ব্যক্তিগত, প্রশাসনিক কিংবা আর্থিক বিরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এ জন্য বিষয়টির নিরপেক্ষ ও উচ্চমানের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।