মনির হোসেন, যশোর প্রতিনিধি: যশোর শহরকে পবিত্র রমজান মাসে যানজটমুক্ত রাখা এবং সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে যশোর পৌরসভা। তবে উচ্ছেদকারীদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে প্রায় প্রায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না-এমনটিই বলছেন সচেতন মহল।
আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বেলা ৩ টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শহরের ব্যস্ততম চৌরাস্তা মোড় থেকে শুরু হয়ে এমকে রোড হয়ে দড়াটানা পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানকালে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা, অস্থায়ী দোকানপাট ও সাইনবোর্ড অপসারণ করা হয়। প্রথম দফার অভিযানে ফুটপাত থেকে শতাধিক দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে অভিযানের খবর পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী আগেই তাদের দোকান সরিয়ে নেন।
দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রথম দফার অভিযান শেষে দ্বিতীয় দফায় দড়াটানা হয়ে মুজিবসড়ক ও প্যারিস রোড এলাকায় অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন যশোর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন।
তিনি বলেন, “শহরের ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসন এবং পৌরবাসীর স্বাভাবিক চলাচলের পথ সুগম করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে রমজান মাসে শহরের শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। ফুটপাত দখল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
অভিযানে অংশ নেন ইন্সপেক্টর মনিরুজ্জামান নয়ন, আব্দুর রাজ্জাক মন্টু, দেলোয়ার হোসেন, সৈয়দ মোহাম্মদ আলী ও মেহেদী হাসান।
বিশ্লেষণ: উচ্ছেদে সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান কোথায়?
যশোর শহরে যানজট নিরসনে ফুটপাত উচ্ছেদ নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায়ই এমন অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযান চলাকালে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো কিছুটা ফাঁকা হয়, পথচারীরা স্বস্তি পান। কিন্তু বাস্তবতা হলো—দু’একদিন পরই আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?
১. জীবিকার তাগিদে পুনরায় দখল
ফুটপাতের অধিকাংশ দোকানি নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের অনেকেরই স্থায়ী দোকান ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য নেই। ফলে উচ্ছেদের পরও জীবিকার তাগিদে তারা আবার একই জায়গায় ফিরে আসেন। বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে এই চক্র চলতেই থাকে।
২. প্রশাসনিক ব্যয় বনাম ফলাফল
উচ্ছেদ অভিযানে প্রশাসনের জনবল, যানবাহন, সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া বারবার একই অভিযান চালানো মানে একই সমস্যার পেছনে বারবার ব্যয়—স্থায়ী সমাধান ছাড়াই। এতে জনসম্পদ ক্ষয় হলেও যানজট স্থায়ীভাবে কমে না।
৩. নগর পরিকল্পনার ঘাটতি
যশোর শহরে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ব্যবসায়িক চাপের তুলনায় পরিকল্পিত হকার জোন বা অস্থায়ী বাজারের সংখ্যা খুবই সীমিত। নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে স্বল্প ভাড়ায় স্টল বরাদ্দ দিলে ফুটপাত দখল অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
৪. আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতার অভাব
অনেক সময় দেখা যায়, অভিযান শুরুর পর কঠোরতা থাকলেও কিছুদিন পর তদারকি শিথিল হয়ে যায়। এতে দোকানিরা আবার পুরোনো জায়গায় ফিরে আসেন। নিয়মিত মনিটরিং ছাড়া শুধুমাত্র “অভিযান” নির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর হয় না।
সম্ভাব্য সমাধান কী?
বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন
১. নির্দিষ্ট হকার জোন স্থাপন
২. স্বল্প ভাড়ায় লাইসেন্স প্রদান
৩. ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সহায়তা
৪. নিয়মিত মনিটরিং ও আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা
৫. ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সমন্বিত সংলাপ
রমজানকে সামনে রেখে শহরের শৃঙ্খলা রক্ষায় উচ্ছেদ অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এই উদ্যোগ কেবল সাময়িক স্বস্তি দেবে—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।
তারা মনে করেন- শুধু উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনাই পারে যশোর শহরকে সত্যিকার অর্থে যানজটমুক্ত রাখতে।
প্রতিনিধির নাম 



















