মনির হোসেন, যশোর জেলা প্রতিনিধি : ভারত ভ্রমণ ভিসায় আরোপিত বিধিনিষেধ এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়ায় দিন দিন কমে যাচ্ছে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত। ফলে একসময় যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকা বেনাপোল স্থলবন্দরের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ভোর হতেই যেখানে শুরু হতো হাজারো মানুষের কোলাহল, ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ সারি আর ট্রাভেল এজেন্টদের হাঁকডাক সেখানে এখন ভর করেছে সুনসান নীরবতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত সরকার ভ্রমণ ভিসায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরে সীমিত পরিসরে মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসা চালু করা হলেও পর্যটন, ব্যবসা ও অন্যান্য ভিসা স্বাভাবিক করা হয়নি। এর ফলে চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পর্যটনের উদ্দেশে ভারতে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছে সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি।
বেনাপোল-ঢাকা, বেনাপোল চট্রগ্রাম, বেনাপোল- বরিশালসহ বিভিন্ন রুটের দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাসগুলো পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছে না। ফলে চালক, হেল্পার ও বুকিং কাউন্টারের স্টাফরা চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। স্টেশন ও টার্মিনাল সংলগ্ন ফুটপাতের ক্ষুদ্র দোকানদার এবং রেস্তোরাঁ মালিকদের দৈনিক বেচাকেনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত।
ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ দিনে (১১-২০ মে) বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে মাত্র ১৬ হাজার ২২১ জন পাসপোর্টযাত্রী যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি ১১ হাজার ৬৮৯ জন, ভারতীয় ৪ হাজার ৪৭৭ জন ও অন্যান্য দেশের ৫৫ জন। এ ১০ দিনে ভারতে গেছেন ৫ হাজার ৫৬০ জন বাংলাদেশি, দুই হাজার ২১৭ জন ভারতীয় ও বিদেশী ২৫ জন। আর ভারত থেকে এসেছেন ৬ হাজার ১২৯ জন বাংলাদেশি, দুই হাজার ২৬০ জন ভারতীয় ও ৩০ জন বিদেশী। এর আগে প্রতিদিন এ পথে ৯ থেকে ১০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতেন। সেখানে এখন গড়ে মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার বিভিন্ন দেশের যাত্রী যাতায়াত করছেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশি রোগি, ছাত্র ও ভারতীয় ল্যাগেজ পার্টির সংখ্যাই বেশি।
বেনাপোল থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিলোমিটার। সহজ যোগাযোগের কারণে চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা ও পর্যটনের জন্য বহু বাংলাদেশি এ রুটে যাতায়াত করেন। বন্দর এলাকায় নেই পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনিসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। শৌচাগার, বিশ্রামাগার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবকিছু নিয়েই অভিযোগ রয়েছে যাত্রীদের।
ভুক্তভোগী পাসপোর্টধারী শ্যামল কুমার রায় বলেন, ভ্রমণ কর বাড়লেও সেবা বাড়েনি। রোদবৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আরেক পাসপোর্টধারী নূরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা থেকে ৫ ঘণ্টায় বেনাপোলে আসা গেলেও ইমিগ্রেশন ও বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয় সকাল সাড়ে ৬টার পর। আগের মতোই দুর্ভোগ রয়ে গেছে।
এ ছাড়া সীমান্তের দুই পাড়ের ইমিগ্রেশন, কাস্টম ও বন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে যাত্রীদের। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে ছিনতাই ও প্রতারণার শিকার হওয়ার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের। এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনি।
মানিচেঞ্জার ব্যবসায়ী আবুল বাশার জানান, একসময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীদের দীর্ঘ সারি, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের ব্যস্ততা, ট্রাভেল এজেন্সি, মানি এক্সচেঞ্জ, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত বেনাপোল প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল। কিন্তু বর্তমানে যাত্রী সংকটে এসব ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দৈনিক পরিচালন ব্যয় তুলতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
পাসপোর্টধারীরা জানান, ভারতে চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য ভিসা পেতে এখনও নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তারা আশা করেছিলেন ভারতের নির্বাচন শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু এখনো বিধিনিষেধ বহাল থাকায় সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমেনি। জরুরি চিকিৎসার জন্য যারা যেতে চাচ্ছেন, তারাও সময়মতো ভিসা পাচ্ছেন না। ভিসা জটিলতার কারণে যাত্রী আগমন এবং বহির্গমন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। আমরা আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, আমাদের প্রায় ব্যবসার কাজে যেতে হয় ভারতে। ভারতীয় নাগরিকেরা সহজে বাংলাদেশি ভিসা পেলেও বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমাদের ব্যবসায়ীরা। যাত্রীদের বন্দরে কাঙ্খিত সেবা বাড়েনি। বন্দরে যাত্রী ছাউনি না থাকায় রোদ, বৃষ্টিতে ভিজে যাত্রা করতে হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় প্রতিনিয়ত পাসপোর্টধারীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন উভয় চেকপোস্টে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেকপোস্ট ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক সুলতান মাহামুদ বিপুল জানান, ভারত সরকার দ্রুত ভ্রমণ ভিসা স্বাভাবিক করলে দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ বাড়বে, চিকিৎসা ও পর্যটন খাত পুনরুজ্জীবিত হবে এবং সীমান্ত এলাকার অর্থনীতিতে আবারও গতি ফিরে আসবে।
বেনাপোল আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের ইনচার্জ বন্দরের সহকারি পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, পাসপোর্টধারী যাত্রীদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে ভিসা জটিলতার কারণে যাত্রী সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কম। তবে আমরা আশাবাদী সামনের দিনে এ সংকট কেটে যাবে।
বাংলাদেশ-ভারত চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক (ল্যান্ডপোর্ট) মতিয়ার রহমান বলেন, ভিসাকেন্দ্রগুলো এখন কেবল জরুরি মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসার জন্য সীমিত পরিসরে সøট দিচ্ছে। ব্যবসা ও ভ্রমন ভিসার যাত্রীদের সংখ্যা নেই বললেই চলে। ভারত ভিসা সেবা বন্ধ রাখায় ব্যবসা, ভ্রমণ, কিংবা অন্যান্য কাজে বাংলাদেশিরা যেমন যেতে পারছেন না, তেমনি ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভারতীয়রাও। আমাদের চেকপোস্টের চেয়ে তাদের চেকপোস্টের অবস্থা আরো করুণ।
স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, ভারতীয় ভিসা দ্রুত স্বাভাবিক করা না হলে দুই দেশের মানুষের মধ্যকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি সীমান্ত এলাকার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। ভিসা জটিলতা না কাটলে আগামীতে যাত্রী পারাপার কমে আসবে। এখন যারা যাতায়াত করছে এদের অধিকাংশই মেডিকেল ও স্টুডেন্ট ভিসায়। যাত্রী না থাকায় বন্দরের রাজস্ব আয় অনেকটা কমে গেছে। যাত্রী সেবা বাড়াতে বন্দরে যাত্রী ছাউনির জন্য জায়গা অধিগ্রহণের কাজ চলছে। যাত্রী নিরাপত্তার প্রতি সজাগ থাকতে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বেনাপোল বন্দর দিয়ে সড়ক ও রেলপথে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের যাতায়াত হয়ে থাকে। তবে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে মূলত স্থলপথেই ভারত ভ্রমণের সুযোগ সীমিত আকারে চালু রয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 


















