মোঃ আমিনুল ইসলাম: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক গভীর আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন এই বিশ্বাসে যে, প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ নিরাপদে ফেরত পাবেন। কিন্তু গত এক দশকে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণের পাহাড়, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ সুবিধা এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে সেই বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে জনমনে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—ক্ষমতায় যে-ই আসুক না কেন, কেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের শিকার হয়? কেন সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থের চেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা বেশি গুরুত্ব পায়?
অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক প্রভাব। যখন কোনো গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান নেয়, তখন তারা সহজেই বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা পেয়ে যায়। এসব ঋণের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় ব্যাংক, সরকার এবং সাধারণ জনগণকে।
গত সরকারের আমলে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও বিতর্কের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে কিছু বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ, বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনায় দেশের কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক সংকটে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে বহু আমানতকারী তাদের সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছেন। অনেক পরিবার তাদের জীবনের সঞ্চয় আটকে যাওয়ায় আর্থিক দুর্ভোগে পড়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—নতুন ঋণ বিতরণের আগে কেন আমানতকারীদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে না?
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং দুর্বল শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, যদি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া আবারও বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়, তাহলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ আমানতকারীরাই।
অন্যদিকে দেশের বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এসব ব্যাংকের পরিচালনা, মালিকানা কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক নীতিমালার পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অনেক গ্রাহক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, অতীতের বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলো যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আবার ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে সংস্কারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন জবাবদিহি। যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক লুট, ঋণ জালিয়াতি কিংবা অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বৃদ্ধি, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং আমানতকারীদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন জনগণ তার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে। যদি ব্যাংকগুলো বারবার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের যন্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সময় এসেছে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যাংকিং খাতকে প্রকৃত অর্থে জনগণের সম্পদ হিসেবে রক্ষা করার।
কারণ ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি কোটি কোটি আমানতকারীর বিশ্বাস, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক।
প্রতিনিধির নাম 
























