ঢাকা ১২:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পটিয়ায় এসএসসিতে প্রতি ১০০ জনে ফেল ৪৫ জন, একবছরে উধাও ২০১ জিপিএ-৫, শিক্ষায় ধস? টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হেড মাঝিকে লক্ষ্য করে গুলি, মামলার দুই আসামি আটক উখিয়ায় অপহৃত দুই মাদ্রাসাছাত্র এক মাস পর উদ্ধার, মুক্তিপণ দিতে হয়নি বোয়ালখালীতে জাতীয় পার্টি নেতা একরামুল হকের মৃত্যুতে আমানসহ দক্ষিণ জেলা জাপা’র শোক প্রেসক্লাব যশোরের সদস্য ফরম বিতরণ শুরু ১২ আগস্ট প্রেসক্লাব যশোরের সদস্য ফরম বিতরণ শুরু ১২ আগস্ট বরুড়ায় নিজ খরচে স্পিড ব্রেকারে রং করলেন সাংবাদিক শরীফ উদ্দিন ক্বলবুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন কক্সবাজারে র‌্যাবের জালে ডাবল মার্ডার মামলার পলাতক আসামি সন্ত্রাসী সাদ্দাম হোসেন গ্রেফতার ভাড়া বাসা থেকে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার, রহস্য

পটিয়ায় এসএসসিতে প্রতি ১০০ জনে ফেল ৪৫ জন, একবছরে উধাও ২০১ জিপিএ-৫, শিক্ষায় ধস?

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:২২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী: গত বছর যেখানে চট্টগ্রামের পটিয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ পাস করেছিল, এবার সেখানে পাস করেছে মাত্র ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জনে প্রায় ৪৫ জনই ফেল করেছে। শুধু পাসের হারেই ধস নয়, এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২০১ জন। পটিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষার এমন ফল বিপর্যেয় এখন প্রশ্ন উঠেছে সমস্যা কোথায়?

শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা, পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি পর্যাপ্ত একাডেমিক সহায়তার অভাব এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক একাডেমিক মনিটরিংয়ের দুর্বলতাকে ফল বিপর্যেয়র সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বিষয়ক সংশ্লিষ্টরা। তার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কতটা কার্যকর হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা আদৌ পাঠ বুঝছে কি না এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা হচ্ছে কি না।

পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর উপজেলার ৪৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫ হাজার ৭৪৮ জন। পাস করেছে মাত্র ৩ হাজার ১৭৯ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ গত বছর ৪২টি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পয়েন্ট। সহজ হিসাব বলছে, এবার প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

এদিকে, পাসের হারের সঙ্গে জিপিএ-৫-এর চিত্রও উদ্বেগজনক। গত বছর পটিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪১০ জন। এবার পেয়েছে মাত্র ২০৯ জন। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ২০১জন। এমনকি পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই সূচকেই একসঙ্গে বড় পতন হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে ফলাফল বিশ্লেষণে এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। শিক্ষার মৌলিক দুটি বিষয়ে দুর্বলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। বিশেষ করে গণিতের মৌলিক ধারণা, ইংরেজি ব্যাকরণ, লিখিত উত্তর প্রদানের দক্ষতা এবং নিয়মিত অনুশীলনের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকে।শিক্ষাবিদদের মতে, এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে কয়েক মাসের প্রস্তুতি দিয়ে গণিত ও ইংরেজির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা তৈরি করতে হবে। পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) দিপন কান্তি দে বলেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পটিয়া উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক ফলাফলের তারতম্য, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তার অভাব অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এছাড়াও প্রশ্নপত্রের কাঠামো ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে শিখনঘাটতি নিরসন, রেমিডিয়াল কার্যক্রম, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক মেন্টরিং ও একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, পটিয়ার ফলাফল বিপর্যয় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেও পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই ক্ষেত্রেই বড় পতন হয়েছে। চলতি বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। গত বছর পেয়েছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন। বোর্ডে এবার ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন।

মেয়েরা এগিয়ে বোর্ডের ফলাফলে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ২৭৫ জন, ছাত্র ৪ হাজার ১২৩ জন।

অপরদিকে, পটিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে চিটাগাং আইডিয়াল হাই স্কুল। ১০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৬ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৩ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। দ্বিতীয় গৈড়লা খরনখাইন প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয় ৬২ জনের মধ্যে ৫৪ জন পাস, হার ৮৭ দশমিক ১০ শতাংশ। তৃতীয় আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ২৪৮ জনের মধ্যে ২০৪ জন পাস, হার ৮২ দশমিক ২৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫ জন।
চতুর্থ মনসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ পাসের হার ৮০ দশমিক ১৮ শতাংশ। পঞ্চম মোজাফরাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৮০ শতাংশ। ষষ্ঠ আরফা করিম উচ্চ বিদ্যালয় ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সপ্তম জঙ্গলখাইন উচ্চ বিদ্যালয় ৭৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। অষ্টম এস আলম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। নবম পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ৭২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দশম মুকুট নাইট উচ্চ বিদ্যালয় ৭১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

তবে এবারের ফলাফলে পাসের হারে শীর্ষে না থাকলেও জিপিএ-৫ এর হিসাবে এবারও উপজেলায় সেরা আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ২৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০৪ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৫ জন। দ্বিতীয় পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় জিপিএ-৫ ২৪ জন। তৃতীয় এস আলম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ জিপিএ-৫ ২২ জন।

এবার উপজেলার ২৩টি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮৬৫ জন। পাস করেছে ৬২৯ জন। পাসের হার ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। দাখিলে সেরা হয়েছে মেহেরআটি হযরত নুরুদ্দীন শাহ দাখিল মাদ্রাসা। ৩৫ জনের সবাই পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। দ্বিতীয় নলান্দা গাউসিয়া বদরিয়া দাখিল মাদ্রাসা পাসের হার ৯৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তৃতীয় দক্ষিণ আশিয়া গাউছিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা পাসের হার ৯০ শতাংশ।

পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় পটিয়া থেকে ৩৫৩ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ১৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ৪১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষাতেও এবার ফলাফলে বড় পতন ঘটেছে।

অপেক্ষাকৃত খারাপ ফলাফলের দিকে পটিয়ার ৩ বিদ্যালয় রয়েছে তাদের মধ্যে- শাহ আমির উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেন ৬৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ১৩ জন, পাশের হার ১৯.৪০%, বাথুয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৫৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৫ জন, পাশের হার ২৫.৮৬% ও হাইদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ৫৩ জন! পাশের হার ২৭.৭৫%। তবে এ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের কোন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাইনি।

পটিয়া পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ড রাজার বাড়ির এসএসসি পরীক্ষার্থী
সাব্বির আহমদ চৌধুরী বলেন,গণিত ও ইংরেজিতে নিয়মিত অনুশীলন না করলে শেষ মুহূর্তে ভালো করা কঠিন। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার কয়েক মাস আগে থেকে সিরিয়াস হয়েছে। আগে থেকে নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া হলে প্রস্তুতি আরও ভালো হতো।

আকতার বলেন, ক্লাসে পড়ানো হলেও অনেক সময় না বোঝা বিষয়গুলো আলাদাভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ কম থাকে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলে ফল আরও ভালো হতে পারত। অভিভাবকেরা বলছেন, শুধু এসএসসির আগে ভালো ফলের জন্য চাপ দিলে হবে না। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতেই কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল তা চিহ্নিত করতে হবে। এরপর তাকে আলাদা সহায়তা দিতে হবে।

শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ দরকার। অনেক অভিভাবক সন্তান স্কুলে যাচ্ছে কি না বা কী পড়ছে, সেটাও নিয়মিত জানতে পারেন না। আবার বিদ্যালয় থেকেও দুর্বল শিক্ষার্থীর বিষয়ে অভিভাবককে সবসময় জানানো হয় না।

এদিকে, পটিয়ার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ফল প্রকাশের পর সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলমগীর বাবু হতাশা প্রকাশ করে বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে হাবিবুল্লাহ বাবুল নামে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানোন্নয়ন পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

ফল বিপর্যেয়র পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দায়টা আসলে কার। শিক্ষার্থীর অনিয়মিত পড়াশোনা, অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, শিক্ষকের পাঠদানের দুর্বলতা, নাকি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন ও একাডেমিক মনিটরিংয়ের ঘাটতি এসব প্রশ্ন এবার সামনে এসেছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর আবু জাফর চৌধুরী বলেন, অন্যান্য বারের তুলনায় এবার ফলাফল বিপর্যয় বেশি হয়েছে। পটিয়ায় দেখলাম কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।,পর্যাপ্ত বেতন প্রদান ছাড়া মেধাসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে না। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিরপেক্ষ হতে হবে, গভর্নিং বডি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবমুক্ত হতে হবে, উপযুক্ত গভর্নিং বডি থাকতে হবে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় মানসম্মত শিক্ষা ও প্রত্যাশিত ফল আশা করা যায়না।

এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, আমরা দেখতে পাই যে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে গভর্নিং বডির সদস্যগণ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রভাবিত করে থাকেন। এতে পক্ষপাতহীন নিয়োগ সম্ভব হয় না। এতে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হয় না। আমার জানামতে গভর্নিং বডির সদস্যরা লেখাপড়ার উন্নতির কোনো চিন্তা বা চেষ্টা করেন না বরং কিভাবে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন সেই চেষ্টাই করে থাকেন। যেমন স্কুলের দোকান বা অন্যান্য জমি থেকে কিভাবে লাভবান হওয়া যায় সেই চেষ্টা করতে দেখা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে হলে উপর্যুক্ত ত্রুটিগুলো দুুর করতে হবে। প্রধান শিক্ষককে স্বাধীনভাবে স্কুল পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। পটিয়ার ফলাফলে দেখলাম সরকারি আবদুর রহমান গার্লস স্কুল প্রথম পজিশনে, পটিয়া আদর্শ স্কুল দ্বিতীয় এবং এস আলম স্কুল তৃতীয় পজিশনে আছে। এস আলম স্কুল প্রায় নতুন, কিন্তুু তাদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সুশৃঙ্খল পরিচালনায় তারা দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছেন।শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কারণ দিয়ে এবারের ফল বিপর্যয় ব্যাখ্যা করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পাঠদান পদ্ধতি, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার প্রশ্ন। তারা বলছেন, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর শুধু পরবর্তী বছর ভালো ফল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন বিষয়ে কতজন ফেল করেছে, কেন ফেল করেছে, কোন শিক্ষক কোন বিষয়ে পড়ান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন ছিল, কতগুলো পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কী ব্যবস্থা ছিল এসব তথ্য নিয়ে বিদ্যালয়ভিত্তিক একাডেমিক অডিট করা যেতে পারে। গণিত ও ইংরেজিতে বিশেষ ক্লাস, নিয়মিত মডেল টেস্ট, রেমিডিয়াল ক্লাস, শিক্ষক মেন্টরিং এবং মাসিক একাডেমিক মনিটরিং চালু করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

এবার পটিয়ায় ৯টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ৬ হাজার ৮২৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে এসএসসি ৫ হাজার ৬৮৫ জন, দাখিল ৮৩৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৩০৬ জন। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফলে এবারের ধস তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয় এটি পটিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এখন দেখার বিষয়, ফলাফল প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন কীভাবে এই ফলাফল বিশ্লেষণ করে। ভুলগুলো শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, নাকি আগামী বছরও শুধু ফল প্রকাশের পর ভালো-মন্দের হিসাবেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, জিপিএ-৫ হারানো শুধু একটি সংখ্যা কমে যাওয়া নয় একজন শিক্ষার্থীর অকৃতকার্যতা শুধু একটি ফলাফল নয় এর পেছনে থাকে একটি পরিবারের প্রত্যাশা, সময়, শ্রম ও ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশ। পটিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার শিখনমান, পাঠদান পদ্ধতি ও একাডেমিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে এবার এসএসসি ফল বিপর্যয় স্কুলের প্রধান শিক্ষকগণ নড়ে চড়ে বসে এবং কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে নতুন করে ঘুরে দাড়নোর চেষ্টা করছে। ফল বিপর্যয় স্কুল গুলোর প্রধান শিক্ষকরা নতুন করে ইতিমধ্যে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতে ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল করার আশাবাদি তারা।

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

পটিয়ায় এসএসসিতে প্রতি ১০০ জনে ফেল ৪৫ জন, একবছরে উধাও ২০১ জিপিএ-৫, শিক্ষায় ধস?

পটিয়ায় এসএসসিতে প্রতি ১০০ জনে ফেল ৪৫ জন, একবছরে উধাও ২০১ জিপিএ-৫, শিক্ষায় ধস?

আপডেট সময় : ১০:২২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

পটিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে সেলিম চৌধুরী: গত বছর যেখানে চট্টগ্রামের পটিয়ায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ পাস করেছিল, এবার সেখানে পাস করেছে মাত্র ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জনে প্রায় ৪৫ জনই ফেল করেছে। শুধু পাসের হারেই ধস নয়, এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২০১ জন। পটিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষার এমন ফল বিপর্যেয় এখন প্রশ্ন উঠেছে সমস্যা কোথায়?

শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা, পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি পর্যাপ্ত একাডেমিক সহায়তার অভাব এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক একাডেমিক মনিটরিংয়ের দুর্বলতাকে ফল বিপর্যেয়র সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা বিষয়ক সংশ্লিষ্টরা। তার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কতটা কার্যকর হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা আদৌ পাঠ বুঝছে কি না এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা হচ্ছে কি না।

পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর উপজেলার ৪৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫ হাজার ৭৪৮ জন। পাস করেছে মাত্র ৩ হাজার ১৭৯ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ গত বছর ৪২টি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পয়েন্ট। সহজ হিসাব বলছে, এবার প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

এদিকে, পাসের হারের সঙ্গে জিপিএ-৫-এর চিত্রও উদ্বেগজনক। গত বছর পটিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৪১০ জন। এবার পেয়েছে মাত্র ২০৯ জন। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ২০১জন। এমনকি পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই সূচকেই একসঙ্গে বড় পতন হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে ফলাফল বিশ্লেষণে এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। শিক্ষার মৌলিক দুটি বিষয়ে দুর্বলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। বিশেষ করে গণিতের মৌলিক ধারণা, ইংরেজি ব্যাকরণ, লিখিত উত্তর প্রদানের দক্ষতা এবং নিয়মিত অনুশীলনের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকে।শিক্ষাবিদদের মতে, এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে কয়েক মাসের প্রস্তুতি দিয়ে গণিত ও ইংরেজির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা তৈরি করতে হবে। পটিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) দিপন কান্তি দে বলেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পটিয়া উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক ফলাফলের তারতম্য, শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি, পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তার অভাব অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এছাড়াও প্রশ্নপত্রের কাঠামো ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে শিখনঘাটতি নিরসন, রেমিডিয়াল কার্যক্রম, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক মেন্টরিং ও একাডেমিক মনিটরিং জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, পটিয়ার ফলাফল বিপর্যয় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেও পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুই ক্ষেত্রেই বড় পতন হয়েছে। চলতি বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত বছর ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। গত বছর পেয়েছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন। বোর্ডে এবার ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন।

মেয়েরা এগিয়ে বোর্ডের ফলাফলে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ২৭৫ জন, ছাত্র ৪ হাজার ১২৩ জন।

অপরদিকে, পটিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে চিটাগাং আইডিয়াল হাই স্কুল। ১০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৯৬ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯৩ দশমিক ২০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০ জন। দ্বিতীয় গৈড়লা খরনখাইন প্রাণহরি উচ্চ বিদ্যালয় ৬২ জনের মধ্যে ৫৪ জন পাস, হার ৮৭ দশমিক ১০ শতাংশ। তৃতীয় আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ২৪৮ জনের মধ্যে ২০৪ জন পাস, হার ৮২ দশমিক ২৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫ জন।
চতুর্থ মনসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ পাসের হার ৮০ দশমিক ১৮ শতাংশ। পঞ্চম মোজাফরাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৮০ শতাংশ। ষষ্ঠ আরফা করিম উচ্চ বিদ্যালয় ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সপ্তম জঙ্গলখাইন উচ্চ বিদ্যালয় ৭৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। অষ্টম এস আলম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। নবম পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ৭২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দশম মুকুট নাইট উচ্চ বিদ্যালয় ৭১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

তবে এবারের ফলাফলে পাসের হারে শীর্ষে না থাকলেও জিপিএ-৫ এর হিসাবে এবারও উপজেলায় সেরা আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ২৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০৪ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৫ জন। দ্বিতীয় পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় জিপিএ-৫ ২৪ জন। তৃতীয় এস আলম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ জিপিএ-৫ ২২ জন।

এবার উপজেলার ২৩টি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮৬৫ জন। পাস করেছে ৬২৯ জন। পাসের হার ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। দাখিলে সেরা হয়েছে মেহেরআটি হযরত নুরুদ্দীন শাহ দাখিল মাদ্রাসা। ৩৫ জনের সবাই পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। দ্বিতীয় নলান্দা গাউসিয়া বদরিয়া দাখিল মাদ্রাসা পাসের হার ৯৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তৃতীয় দক্ষিণ আশিয়া গাউছিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা পাসের হার ৯০ শতাংশ।

পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় পটিয়া থেকে ৩৫৩ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে ১৮৫ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ৪১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষাতেও এবার ফলাফলে বড় পতন ঘটেছে।

অপেক্ষাকৃত খারাপ ফলাফলের দিকে পটিয়ার ৩ বিদ্যালয় রয়েছে তাদের মধ্যে- শাহ আমির উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেন ৬৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাশ করেছে ১৩ জন, পাশের হার ১৯.৪০%, বাথুয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৫৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৫ জন, পাশের হার ২৫.৮৬% ও হাইদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাশ করেছে ৫৩ জন! পাশের হার ২৭.৭৫%। তবে এ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের কোন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাইনি।

পটিয়া পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ড রাজার বাড়ির এসএসসি পরীক্ষার্থী
সাব্বির আহমদ চৌধুরী বলেন,গণিত ও ইংরেজিতে নিয়মিত অনুশীলন না করলে শেষ মুহূর্তে ভালো করা কঠিন। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার কয়েক মাস আগে থেকে সিরিয়াস হয়েছে। আগে থেকে নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া হলে প্রস্তুতি আরও ভালো হতো।

আকতার বলেন, ক্লাসে পড়ানো হলেও অনেক সময় না বোঝা বিষয়গুলো আলাদাভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ কম থাকে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলে ফল আরও ভালো হতে পারত। অভিভাবকেরা বলছেন, শুধু এসএসসির আগে ভালো ফলের জন্য চাপ দিলে হবে না। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতেই কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল তা চিহ্নিত করতে হবে। এরপর তাকে আলাদা সহায়তা দিতে হবে।

শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ দরকার। অনেক অভিভাবক সন্তান স্কুলে যাচ্ছে কি না বা কী পড়ছে, সেটাও নিয়মিত জানতে পারেন না। আবার বিদ্যালয় থেকেও দুর্বল শিক্ষার্থীর বিষয়ে অভিভাবককে সবসময় জানানো হয় না।

এদিকে, পটিয়ার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ফল প্রকাশের পর সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলমগীর বাবু হতাশা প্রকাশ করে বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে হাবিবুল্লাহ বাবুল নামে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানোন্নয়ন পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

ফল বিপর্যেয়র পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দায়টা আসলে কার। শিক্ষার্থীর অনিয়মিত পড়াশোনা, অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, শিক্ষকের পাঠদানের দুর্বলতা, নাকি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন ও একাডেমিক মনিটরিংয়ের ঘাটতি এসব প্রশ্ন এবার সামনে এসেছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান শিক্ষাবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর আবু জাফর চৌধুরী বলেন, অন্যান্য বারের তুলনায় এবার ফলাফল বিপর্যয় বেশি হয়েছে। পটিয়ায় দেখলাম কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে আমি মনে করি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।,পর্যাপ্ত বেতন প্রদান ছাড়া মেধাসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যাবে না। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিরপেক্ষ হতে হবে, গভর্নিং বডি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবমুক্ত হতে হবে, উপযুক্ত গভর্নিং বডি থাকতে হবে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় মানসম্মত শিক্ষা ও প্রত্যাশিত ফল আশা করা যায়না।

এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, আমরা দেখতে পাই যে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে গভর্নিং বডির সদস্যগণ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রভাবিত করে থাকেন। এতে পক্ষপাতহীন নিয়োগ সম্ভব হয় না। এতে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হয় না। আমার জানামতে গভর্নিং বডির সদস্যরা লেখাপড়ার উন্নতির কোনো চিন্তা বা চেষ্টা করেন না বরং কিভাবে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন সেই চেষ্টাই করে থাকেন। যেমন স্কুলের দোকান বা অন্যান্য জমি থেকে কিভাবে লাভবান হওয়া যায় সেই চেষ্টা করতে দেখা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত ফলাফল পেতে হলে উপর্যুক্ত ত্রুটিগুলো দুুর করতে হবে। প্রধান শিক্ষককে স্বাধীনভাবে স্কুল পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। পটিয়ার ফলাফলে দেখলাম সরকারি আবদুর রহমান গার্লস স্কুল প্রথম পজিশনে, পটিয়া আদর্শ স্কুল দ্বিতীয় এবং এস আলম স্কুল তৃতীয় পজিশনে আছে। এস আলম স্কুল প্রায় নতুন, কিন্তুু তাদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সুশৃঙ্খল পরিচালনায় তারা দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছেন।শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কারণ দিয়ে এবারের ফল বিপর্যয় ব্যাখ্যা করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পাঠদান পদ্ধতি, নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার প্রশ্ন। তারা বলছেন, ফলাফল খারাপ হওয়ার পর শুধু পরবর্তী বছর ভালো ফল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করতে হবে। কোন বিষয়ে কতজন ফেল করেছে, কেন ফেল করেছে, কোন শিক্ষক কোন বিষয়ে পড়ান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন ছিল, কতগুলো পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কী ব্যবস্থা ছিল এসব তথ্য নিয়ে বিদ্যালয়ভিত্তিক একাডেমিক অডিট করা যেতে পারে। গণিত ও ইংরেজিতে বিশেষ ক্লাস, নিয়মিত মডেল টেস্ট, রেমিডিয়াল ক্লাস, শিক্ষক মেন্টরিং এবং মাসিক একাডেমিক মনিটরিং চালু করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

এবার পটিয়ায় ৯টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ৬ হাজার ৮২৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে এসএসসি ৫ হাজার ৬৮৫ জন, দাখিল ৮৩৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ৩০৬ জন। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফলে এবারের ধস তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয় এটি পটিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এখন দেখার বিষয়, ফলাফল প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন কীভাবে এই ফলাফল বিশ্লেষণ করে। ভুলগুলো শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, নাকি আগামী বছরও শুধু ফল প্রকাশের পর ভালো-মন্দের হিসাবেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, জিপিএ-৫ হারানো শুধু একটি সংখ্যা কমে যাওয়া নয় একজন শিক্ষার্থীর অকৃতকার্যতা শুধু একটি ফলাফল নয় এর পেছনে থাকে একটি পরিবারের প্রত্যাশা, সময়, শ্রম ও ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশ। পটিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার শিখনমান, পাঠদান পদ্ধতি ও একাডেমিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে এবার এসএসসি ফল বিপর্যয় স্কুলের প্রধান শিক্ষকগণ নড়ে চড়ে বসে এবং কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে নতুন করে ঘুরে দাড়নোর চেষ্টা করছে। ফল বিপর্যয় স্কুল গুলোর প্রধান শিক্ষকরা নতুন করে ইতিমধ্যে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতে ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল করার আশাবাদি তারা।