একটি জাতি কতটা উন্নত, তা শুধু জিডিপির অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না। মাপা যায় তার নৈতিকতার উচ্চতা দিয়ে, শৃঙ্খলার গভীরতা দিয়ে এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা দিয়ে। আমরা কি কখনো এমন একটি বাংলাদেশের কথা ভেবেছি? যে বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে দাঁড়াবে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও মানবিকতার প্রতীক হয়ে?যেদিন সারা পৃথিবী আমাদেরকে নিয়ে গর্ব করবে? সেদিন কোনো কাজের জন্য ঘুষ লাগবে না। কোনো ফাইল টেবিলে ধুলো জমবে না। কারো সুপারিশ ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতায় চাকরি হবে। ছাত্র ভর্তি হবে মেধায়, পদোন্নতি হবে কাজের মূল্যায়নে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হবে একাডেমিক যোগ্যতায়, দলীয় পরিচয়ে নয়। সেদিন স্কুলে কোনো শিশু বেত্রাঘাতের ভয়ে কাঁপবে না। সে যাবে আনন্দ নিয়ে, শিখবে কৌতূহল নিয়ে। রাস্তায় কোনো বুভুক্ষু মানুষ পড়ে থাকবে না। সমাজে থাকবে শুধু কর্মনিষ্ঠা, দায়বদ্ধতা আর শৃঙ্খলা। রাজনীতিতে থাকবে প্রতিযোগিতা, কিন্তু শত্রুতা নয়। সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে থাকবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। মারামারি নয়, কাটাকাটি নয় — থাকবে “দেশ আগে” নীতিতে ঐক্য। রাষ্ট্রের উন্নয়নে সবাই একযোগে কাজ করবে। বন্যা দুর্গত এলাকায় ত্রাণের খাবার থাকবে ক্যাম্পে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি রুটিও কেউ নেবে না। ত্রাণ কেন্দ্রে পাহারাদার লাগবে না, কারণ প্রতিটি মানুষের বিবেকই হবে সবচেয়ে বড় প্রহরী। কালোবাজারি থাকবে না। কেউ খাবারে ভেজাল মেশাবে না। দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে কেউ মানুষকে জিম্মি করবে না। রাস্তাঘাট থাকবে ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন। শুধু বয়স্ক বা যুবক নয়, একটি শিশুও যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলবে না। কারণ পরিচ্ছন্নতা তার কাছে আইন নয়, অভ্যাস। কোনো অনুষ্ঠান, কোনো সভা এক মিনিটও দেরিতে শুরু হবে না। সময়ের প্রতি শ্রদ্ধাই হবে আমাদের সভ্যতার নতুন পরিচয়। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে মানুষের মনে। এ দেশের মানুষের মধ্যে থাকবে বিনয়। থাকবে ভুল স্বীকারের সংস্কৃতি। এমপি, মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে বলবেন, “আমি কী করতে পেরেছি তার জন্য গুণকীর্তন করবেন না। বরং যা করতে পারিনি, সেটার জন্য ক্ষমা চাই।”অনেকে বলবেন, এটি কল্পনা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিটি জাতির বাস্তবতাও একদিন কল্পনা দিয়েই শুরু হয়েছিল। এই বাংলাদেশ একদিনে তৈরি হবে না। কোনো একক নেতা বা সরকারের পক্ষেও এটি সম্ভব নয়। এর জন্য চাই আমাদের সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও অঙ্গীকার। শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে, কর্মকর্তার টেবিলে, ব্যবসায়ীর দোকানে, কৃষকের মাঠে, রাজনীতিকের মঞ্চে — সর্বত্র একটিই প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে: “আমি আমার জায়গা থেকে দুর্নীতি করব না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না।”যদি আমরা পারি, উন্নয়নে এ দেশ পৃথিবী থেকে এক দশক এগিয়ে যাবে। পৃথিবীর খাবার ফুরিয়ে গেলেও এদেশের গুদামে খাবার থাকবে। কারণ এখানে অপচয় হবে না, চুরি হবে না।সুশৃঙ্খল, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক বাংলাদেশ কোনো অলীক স্বপ্ন নয়। এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, শুরুটা করি নিজের ঘর থেকে। নিজের বিবেক থেকে। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় আজকের আমাদের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের যোগফলে।
লেখক——–
এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ
_সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী_
প্রতিনিধির নাম 


















